Kazi Nazrul Islam
কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামা সঙ্গীত ও কালী সাধনা
বিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে এক নতুন ধারার শাক্ত সঙ্গীত বাংলায় নিয়ে এলেন কাজী নজরুল ইসলাম। শ্যামাকে কাজী নজরুল ইসলাম আত্মসচেতন, নিরহংকারিণী, শুভ-চিন্তার উদ্রেককারিণী , অশুভনাশিনী, আমিত্ববিনাশিনী ইত্যাদি গুণধারিণী হিসেবে দেখিয়েছেন। কখনো তিনি সর্বধর্মে সমন্বয় ঘটান, শ্যামারূপে প্রতিফলিত হয় শ্যামল দেশ, কখনো বা তিনি আসেন সমাজতন্ত্রের রূপকার হয়ে। নজরুল বাংলাগানের সমৃদ্ধ পটভূমিতে শ্যামাকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন কালোরূপে বিশ্বরূপা রূপে, তাঁর পায়ের তলায় আলোর নাচন দেখিয়েছেন, যে আলোর ঝলকে রুদ্র শিবও পরাস্ত যাঁর হাতে আছে বিশ্বের মরণ-বাঁচন।
শ্বেতাঙ্গ- শাসকদের বিনাশিনীরূপে অবতীর্ণা মহাকালীর বীরত্বের কাছে হার মানার প্রতীক হিসেবে বাংলার শোষিত জনগণের বীরত্ব ও আন্দোলনকে নির্দেশ করেছেন নজরুল। মায়ের দিগবসনা হওয়ার ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন এক নতুন ভাবে-
"সিন্ধুতে মা'র বিন্দুখানিক, ঠিকরে পড়ে রূপের মাণিক,
বিশ্বে মায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগবসন। Kazi Nazrul Islam
১৯২৬ সালে ম্যালেরিয়া প্রাদুর্ভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বিদ্রোহী কবি। সেই সময় আর্থিক সঙ্কটেও ভুগছিলেন তিনি। সে কথা জানতে পেরে তাঁকে হুগলি থেকে কৃষ্ণনগরে এনে নিজের বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন নদিয়ার তৎকালীন এমএলসি (লেজিসলেটিভ কাউন্সিল সদস্য) ও বিশিষ্ট বিপ্লবী হেমন্ত সরকার। কৃষ্ণনগর শহরের উত্তর প্রান্তে গোলাপটিতে নিজেদের বাড়িতে কবিকে সপরিবারে থাকতে দিয়েছিলেন তিনি। আর সেখানে থাকার সময়েই কাজী নজরুল ইসলাম ওই বছর কালী পুজো করেছিলেন। হেমন্ত সরকারের ভাইপো নদিয়া জেলার প্রাক্তন বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক) ও বর্তমানে ৮৮ বছরের বৃদ্ধ গৌরীশঙ্কর সরকার কয়েক বছর ধরেই স্থানীয় পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন স্মৃতিকথা শোনাতে গিয়ে এ পুজোর কথাও একাধিক বার লিখেছেন। কিন্তু এত দিন গৌরীশঙ্করের সে লেখায় নেটিজেনদের চোখ সে ভাবে না পড়লেও এ বার সে তথ্যের সত্যতা খুঁজতে মাঠে নেমেছেন অনেকেই।
গৌরীশঙ্কর বলেনন, 'ন'কাকা হেমন্ত সরকার আমাদের গোলাপটির চন্দ্রনাথ ঘোষ লেনের বাড়িতে কবিকে এনে রেখেছিলেন। ওই বছর কোনও এক অমাবস্যায় বাড়িতে কালীপুজো আয়োজন করেছিলেন কবি। লালগোলার যোগাচার্য বরদাকান্ত মজুমদারকে দিয়ে পুজো করিয়েছিলেন। সে পুজোয় লুচি-ফুলকপি, বেগুন ভাজার ভোগ হয়েছিল। পংক্তিভোজনে সেই সময়ের স্বদেশী ভাবনার বিশিষ্ট মানুষেরা প্রসাদ পেয়েছিলেন। যার মধ্যে দুই প্রাক্তন মন্ত্রী তথা দুই বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী স্মরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অমৃতেন্দু মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন।' বর্ষীয়ান গৌরীশঙ্কর এমন স্মৃতিকথা স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় একাধিকবার লিখেছেন। তিনি বলেন, 'স্বাধীনতা সংগ্রামী ও প্রাক্তন মন্ত্রী স্মরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেক স্বাধীনতা সংগ্রামী অনিল চক্রবর্তীর কাছে আমি কবির কালীপুজোর গল্প অনেকবার শুনেছি। আমার জন্ম ১৯৩২ সালে হলেও বিভিন্ন সময়ে আমার মেজদিদি সাবিত্রী ও মা মৃণালিনী দেবীর কাছেও ১৯২৬ সালের সে পুজোর গল্প অনেকবার শুনেছি।' Kazi Nazrul Islam
অজিত দাসের লেখা 'কাজী নজরুল ইসলাম: এক অজ্ঞাত পর্ব' বইয়েও কবির এমন পুজো করার প্রসঙ্গ উল্লেখ আছে। তাঁর এ বইয়েও উল্লেখ আছে, স্বাধীনতা সংগ্রামী অনিল চক্রবর্তী কবির কালীপুজোর প্রসাদ পেয়েছিলেন বলে লেখককে তথ্য দিয়েছিলেন।
ড. বাগচীর অসুস্থ নজরুল সম্পর্কের কথা এখানে তার ভাষায় হুবহু তুলে ধরা হলো। ‘‘নজরুলের অসুস্থতার লক্ষণ যখন প্রথম প্রকাশ পায় তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় নাই। বিশেষ করে তার স্ত্রী প্রমিলা নজরুল যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন (১৯৩৭ইং) তখন দেখা যায় নজরুল হঠাৎ ‘কালী সাধনা' শুরু করেছেন। অনেকেই এটাকে ধরে নেন তার মানসিক বৈকল্য হিসাবে। গেরুয়া পোশাক আর মাথায় গেরুয়া টুপি ছিল তার তখনকার পরিধেয় বস্ত্র।সেই সময় তিনি মাঝে মাঝে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান গাওয়ার সময় একটু আধটু বেসুরো হতে থাকেন। অবশ্য ধরিয়ে দিলে ভুল বোঝেন এবং সংশোধনের চেষ্টাও করেন। কিন্তু পুরোপুরি অসুস্থ হবার পর (১৯৪২ইং) তিনি সব কিছুর বাইরে চলে যান। কোনো কিছুই আর ঠিকমত ধরে রাখতে পারেন না। এরূপ লক্ষণ তার সে সময় প্রকাশ পায়। ড. অশোক বাগচী আরো বলেছেন, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম অসুস্থ ও বাকশক্তি রুদ্ধ হবার পর হতে কোনো চশমাধারী লোককে কখনই সহ্য করতে পারতেন না। চমশাধারী লোক তার সম্মুখে উপস্থিত হলে তৎক্ষণাৎ উত্তেজিত ও অস্বস্তি বোধ করতেন। ড. অশোক বাগচীর ধারণা নিশ্চয়ই কোনো চশমাধারী লোকই সে সময় তার বড় ধরনের ক্ষতি করে দিয়েছিল। যা তার মস্তিষ্কের মধ্যে স্থায়ীভাবে দাগ কেটে দেয়। ড. বাগচী নজরুলের অসুস্থতার অন্য সমস্ত কারণকে অস্বীকার করে একথা বলেছেন যে, কবির ‘স্নায়ুবিক বৈকল্য' সম্পর্কে ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের চিকিৎসার মতামতটাই যথার্থ ছিলো বলে তিনি মনে করেন। তখন তাকে ভারতের রাচী ও বিহারের মধুপুরে পাঠানো এবং অন্যান্য মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োগ তার অসুস্থতাকে বাড়তেই সাহায্য করেছে বলে তিনি মনে করেন। Kazi Nazrul Islam
রাজশাহী জেলার সীমান্ত থেকে বেশি দূরে নয়, পদ্মার অপর পারে মুর্শিদাবাদ জেলায় নিমতিতা নামে একটি গ্রাম আছে। এখানে নজরুল, জানি না ঠিক কিভাবে, বরদাচরণ মজুমদার নামে এক ব্যক্তির সাথে পরিচিত হন। এই বরদাচরণ ছিলেন কালী সাধক। বরদাচরণ নজরুলকে বলেন, তিনি যদি তার কথা মতো কালী সাধনা করেন, তবে তিনি তার রোগ থেকে মুক্ত হবেন। নজরুল বরদাচরণ মজুমদারের পদ্ধতি অনুসারে কালী সাধনা শুরু করেন। রোগটি চিকিৎসার জন্য তখন একটি ওষুধ ছিল, যাকে ইংরেজিতে বলা হতো, ৬০৬। তখনো কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু নজরুল ধরেই নেন চিকিৎসকরা তার অসুখ সারাতে পারবেন না। রোগ সারবে অধ্যাত্ম পদ্ধতিতে। আর বরদাচরণ জানেন সেই পদ্ধতি। নজরুল কেবল কালী সাধনায় প্রমত্ত হন না, রচনা করেন অনেক শ্যামাসঙ্গীত।
লেখেন,
শ্যামা তোর নাম যার জপমালা
তার কি মা ভয় ভাবনা আছে।
দুঃখ অভাব রোগ শোক জরা
লুটায় তাহার পায়ের কাছে॥
নজরুলের এই আধ্যাত্মিক বিবর্তন অনেককেই বিস্মিত করেছিল। কেননা যে কবি একদিন লিখতে পেরেছিলেন,
বল বীর
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-
বিধাত্রীর!
নজরুলের একটি গানেই হয়ত কালীকে বিভিন্নরূপে তিনি দেখছেন :
'আজই না হয় কালই তোরে কালী কালী বলবে লোকে।
(তুই) কালি দিয়ে লিখলি হিসাব কেতাব পুঁথি, শিখলি পড়া,
তোর মাঠে ফসল ফুল ফোটালো কালো মেঘের কালি-ঝরা।
তোর চোখে জ্বলে কালির কালো, তাই জগতে দেখিস আলো
(কালী)-প্রসাদ গুণে সেই আলো তুই হূদ-পদ্মে দেখবি কবে?'
এই গানে 'কালী' শব্দটিকে গুরুত্ব প্রদান করে দেশপ্রেমের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন কবি। কালি অর্থে বিদ্যার আধার কলমের কালি, কালী অর্থে দেবী মহামায়া, ভূমি ও স্বদেশ আবার কালি অর্থে জল- জীবন ও জীবিকার উপাদান। Kazi Nazrul Islam
নজরুল দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিমে বিভাজিত সে সময়কার ভারতীয় সমাজে। মুসলিম হওয়ার কারণে হিন্দুদের একটা শ্রেণী নজরুলকে বিজাতি মনে করত। ঠিক একইভাবে একশ্রেণীর মুসলমান নজরুলকে বিজাতি ঘোষণা করেছিল, কারণ ছিল হিন্দু ধর্মের প্রতি নজরুলের আগ্রহ। কিন্তু এত বিরোধিতার মধ্যেও দিগভ্রষ্ট না হয়ে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন, মনেপ্রাণে থেকেছেন শুধু 'মানুষ' হয়ে।
******************
page
seo
blog
blogger
blogspot
Book
news
learn
press
media
find out
Literary Agents
literature
religion
economics
politics
world
bengali
bangladesh
dhaka
entertainment
Current affairs
current world
Kazi Nazrul Islam
Poet
Bangladesh
0 Comments