Radha Krishnan
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, কল্পকাহিনী না সত্য?
(এক সত্য অনুসন্ধানের খোঁজে ধৈর্য্যের সাথে পড়ে; আবেগ নয় বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করুন)
কিছু লীলামগ্ন ভক্ত এখনো বিশ্বাস কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তারা লজিক বোঝে না। খালি জানে ঐ এক কথা, "সবিই লীলা।"
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, ‘বিষ্ণুপুরাণ’ ও ‘ভগবত পুরাণ’ এই তিন গ্রন্থে আমরা কৃষ্ণের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার বর্ণনা পাই। কৃষ্ণের উল্লেখ পাওয়া প্রথম গ্রন্থ মহাভারতে রাধার সামান্যতম ইঙ্গিত নেই। কিন্ত বাই ঐ তিন গ্রন্থেই কৃষ্ণের প্রেমিকা হিসেবে রাধার উপস্থিতি পাওয়া যায়। কৃষ্ণ লীলার অনেকটা অংশ জুড়ে আছে রাধা চরিত্রটি। বর্তমানে সব জায়গাতেই কৃষ্ণের সাথে সাথে রাধাও পূজিত হন, যদিও রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কটি ছিলো সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিতে সম্পুর্ন অবৈধ। কিন্তু তারপরেও গোড়া ও এখনো পুরোমাত্রায় কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজ কেন ও কিভাবে এই সম্পর্কটিকে মর্যাদা দিয়েছে সেটা গবেষণার দাবী রাখে।
মহাভারতে রাধা চরিত্রটির কোন উল্লেখ নেই। তবে লোকমুখে বা হিন্দুদের মধ্যে কৃষ্ণকে জনপ্রিয় করতে রাধা চরিত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। রাধাকে প্রেম নিবেদন, তাতে ব্যর্থ হওয়া ও মথুরায় ফিরে যাওয়ার পরে রাধার বিরহ, সবই হিন্দুরা পবিত্রতার চোখে দেখে। যদিও সমাজ প্রেক্ষাপট বিচারে রাধা ও কৃষ্ণ এর সম্পর্ক কে অবৈধ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না, এবং রাধা-কৃষ্ণ সম্পর্কের আলোকে যদি কৃষ্ণ চরিত্রটি ব্যাখ্যা করা হয়, তবে কৃষ্ণকে এক কথায় চরিত্রহীন বখাটে বলা যায় ।
রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কটিকে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে ব্যখ্যা করেছেন। কারো মতে রাধা-কৃষ্ণর সম্পর্কটি মূলত সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী প্রতিটি সৃষ্টির মূখ্য উদ্দেশ্য পরম সত্ত্বা অর্থাৎ স্রষ্টার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া। সৃষ্টি যেমন স্রষ্টার সাথে এক হতে চায়, তেমনি স্রষ্টাও সৃষ্টির সাথে এক হতে চায়। কিন্তু নানান বাঁধার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না, বা সম্ভব হলেও তা খুবই দুষ্কর। এই অবস্থা বোঝাতেই রাধা ও কৃষ্ণের মধ্যে সম্পর্ককে রূপক অর্থে বোঝানো হয়েছে। Radha Krishnan
বৈষ্ণবরা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মধ্যে পবিত্রতা আনতে প্রেমের সম্পর্কটিকে নিষ্কাম বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মত অনুযায়ী,
‘আত্মইন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে কয় কাম/কৃষ্ণেন্দীয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম’। অর্থাৎ, কৃষ্ণের প্রতি রাধার যে ভালোবাসা বা টান ছিলো তা প্রেম। এর মধ্যে কামের কোন প্রভাব নেই। বৈষ্ণব মতে ঈশ্বর বা কৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ। বাকি সব প্রকৃতি। মরমী সাধক লালন সাই যেমন সারা জীবন মনের মানুষ অর্থাৎ নিজেকে জানার বা আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করেছেন, তেমনি প্রকৃতির লক্ষ্য পুরুষের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া। কোন কোন দার্শনিক রাধা ও কৃষ্ণের এই সম্পর্ককে দর্শনের সবচেয়ে পুরানো ধারণা নিজেকে জানা বা আত্মোপলব্ধির সাথে ব্যাখ্যা করেছেন।
রাধাকৃষ্ণ পৌরাণিক চরিত্র। আর তাই জনপ্রিয় পৌরাণিক চরিত্র নিয়ে হাজার হাজার গুজব বা মূল গল্পের বাইরেও ভ্রান্ত গল্প প্রচারিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
মূল সংস্কৃত ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত, হরিবংশ, চার বেদ, ১২টি উপনিষদ, গীতার ১৮টি অধ্যায় এবং বিষ্ণু পুরান, এককথায় হিন্দু শাস্ত্রের প্রামাণ্য কোনো গ্রন্থে- কোথাও রাধার কোনো উল্লেখ নেই। এই সমস্ত বিষয়, বিচার-বিশ্লেষণ করে, সাহিত্য সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, তার "কৃষ্ণ চরিত্র" গ্রন্থে এক বিশাল প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন,
"তাহা হইলে, এই রাধা আসিলেন কোথা হইতে ?" Radha Krishnan
রাধার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে যথেষ্ট কালিমা লেপন করা হয়। কৃষ্ণকে বিশ্বপ্রেমিক প্রমাণ করতে বলা হয় কৃষ্ণলীলা; আবার কেউ কেউ নিজেদের লাম্পট্যকে ঢাকা দেওয়ার জন্য কৃষ্ণের উদাহরণ টেনে অপরকে প্রশ্ন করে বলে, "কৃষ্ণ করলে লীলা, আর আমরা করলে বিলা ?" এই ব্যাপারটি এতদূর গড়িয়েছে যে, এ নিয়ে গানও বানানো হয়েছে -
"কৃষ্ণ, করলে লীলা, আমরা করলে বিলা" -শিরোনামে।
পশ্চিমবঙ্গের এক গায়ক তো তার গানে বলেছে,
"যমুনারও ঘাটে যাইও না গো রাধা
ওইখানেতে বইস্যা আছে, কানু হারামজাদা।"
কৃষ্ণকে 'হারামজাদা' বলা এই গান নিষিদ্ধ না করে বরং এই গানের তালে তালে আনন্দের সাথে নাচা হয়। ২০১৯ সালের জি বাংলার সা রে গা মা পা এর মত জনপ্রিয় অনুষ্ঠানেও হৈ হুল্লোড় করে গানটা গাওয়া হয়েছিলো। কতটা আহাম্মক ভাবুন। Radha Krishnan
এগুলো ছাড়াও রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে সমগ্র বাংলা এলাকায় আরো অনেক গান কবিতা আছে, যেগুলোর বেশির ভাগই আদি রসাত্মক এবং যেগুলো কৃষ্ণকে নেগেটিভ ভাবেই প্রকাশ করেছে।
বলা হয়, কৃষ্ণ শুধু রাধার সাথেই প্রেম করেনি, সে নাকি প্রেম করেছে, রাধার সখীদেরও সাথে। তর্কের খাতিরে, রাধার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলেও তো এই ব্যপারটা একেবারে অসম্ভব। কারণ, কৃষ্ণ রাধার সাথে প্রেম করাকালীন, রাধার সখীদের সাথেও প্রেম করবে, আর সেটা রাধা মেনে নেবে, এই তত্ত্ব শুধু নির্বোধদের পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব।
এবার বঙ্কিমচন্দ্রের সেই লাখ টাকার প্রশ্নে ফিরে যাই, "তাহা হইলে, এই রাধা আসিলেন কোথা হইতে ?"
ব্যাকরণ দিয়েই শুরু করি, যিনি আরাধনা করেন, তাকে এক কথায় বলা হয় রাধা। এই সূত্রে পৃথিবীর সমস্ত নর-নারী, যারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভজনা বা আরাধনা করেন, তারা রাধা। যদিও এটা রাধার অস্তিত্বকে স্বীকারকারী মানুষের বানানো ব্যাখ্যা, শাস্ত্রে এরকম কিছু নেই; তবু দেখা যাক রাধা শব্দটি নারীবাচক হলো কিভাবে?
জীবাত্মা বা মানুষ যখন, পরমাত্মা বা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে, তখন শক্তিশালী ভগবানের কাছে মানুষ-হীন, দুর্বল ও অসহায়। মেয়েরা অন্যভাবে নেবেন না, আমাদের সামাজিক বাস্তবতাতেও শক্তিশালী পুরুষের কাছে নারীরা এমনই-হীন, দুর্বল ও অসহায়। এভাবে দুর্বল ও অসহায় মানুষ, যারা নারীর প্রতীক, তাদের বোঝাতে রাধা শব্দটি নারীবাচক শব্দে পরিণত হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু একজন পুরুষ এবং তার ভজনা বা আরাধনাকারীরা যেহেতু রাধা এবং কার্যকারিতার দিক থেকে রাধা যেহেতু একটি স্ত্রীবাচক শব্দ, তাই পরমাত্মার প্রতি জীবাত্মার এই আত্মসমর্পণ, কৃষ্ণের প্রতি রাধার আত্মসমর্পনের রূপ পেয়েছে এবং বিরহের প্রচণ্ড ব্যাকুলতা ছাড়া ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করা যেহেতু সম্ভব নয়, তাই রাধা রূপী জীবাত্মা, ক্রমে ক্রমে ভক্ত মানসে নারীরূপী রাধায় পরিণত হয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। আর আমরা সনাতন ধর্মীরা যেহেতু, বেদ- পুরাণে বর্ণিত দেবতাদের রূপ ও তাদের কার্যপ্রণালীকে কল্পনায় নিয়ে ঐসব দেবতাদের মূর্তি তৈরি করতে খুব পারদর্শী, সেহেতু আধ্যাত্মিকভাবে প্রতীকী রাধাকে খুব সহজেই রক্ত মাংসের নারী বানিয়ে কৃষ্ণের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি।
মহাভারত, যা প্রায় ৫ হাজার বছর আগে লেখা, যা কৃষ্ণের প্রামান্য জীবনী, তাতে রাধার কোনো উল্লেখ নেই; সুতরাং গীতাতেও রাধার কথা থাকা সম্ভব নয়। এমন কি বিষ্ণু পুরান, যে বিষ্ণুই কৃষ্ণরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, সেই পুরানেও রাধার কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানের মতো কিছু অর্বাচীন বা নতুন পুরানে রাধা উল্লেখ আছে, এর কারণ কী ? এছাড়াও বৈষ্ণব পদাবলী, যা রাধার, কৃষ্ণের প্রতি প্রেম বিরহ নিয়ে লেখা একাধিক কবির পদ্য এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য, যা মূলত একটি যাত্রাপালা, যাতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম একেবারে মাখামাখি, কৃষ্ণকে নিয়ে এসব রস সাহিত্য সৃষ্টিরই বা কারণ কী ?
কিছু আধুনিক পুরান এবং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে রাধার উপস্থিতিকে প্রামান্য করার জন্যও অবতারণা করা হয়েছে নতুন কাহিনীর।
****************
Current affairs
current wor
ld
page
seo
blog
blogger
blogspot
Book
news
learn
press
media
find out
Literary Agents
literature
religion
economics
politics
world
bengali
bangladesh
dhaka
entertainment
Radha Krishnan
Radha Madhab
Radha
Krishna
Madhab
Govinda
Gopal
0 Comments